মেছো

১৬ জানুয়ারি , ২০২১

আমরা প্রায় সবাই জানি যে ভারতের (এবং বাংলাদেশের) জাতীয় পশু হল, বাঘের একটি উপপ্রজাতি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বা বাংলার বাঘ। কিন্তু আমাদের বেশিরভাগই জানি না যে , আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেরও একটি রাজ্য পশু আছে - বাঘরোল বা মেছোবাঘ বা মেছোবিড়াল। এই প্রাণীটির অনেক নাম থাকলেও এটি স্থানীয়ভাবে বাঘরোল নামেই অধিক পরিচিত। বাঘরোল অনেকটা বিড়ালের মত দেখতে স্তন্যপায়ী প্রাণী।

image

এরা সাধারণত নদীর ধারে , জলাভূমি বা ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে বসবাস করে। এদের গায়ে চিতা বাঘের মত ছোপ ছোপ দাগ থাকায় অনেকেই এদেরকে চিতাবাঘ ভেবে ভুল করে। এরা সাঁতারে খুব পটু হয় , এদের পছন্দের খাবারও আবার মাছ,  তাই এদের নাম মেছোবাঘ বা মেছো বিড়াল।

এমন একটা সুন্দর প্রাণী কিন্তু তুমি শুনলে অবাক, ২০১৬ সালে এদেরকে রেড লিস্টে অসুরক্ষিত বা Vulnerable শ্রেণিভুক্ত করা হয়, কারণ বিগত কিছু বছর ধরে এদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে শুধুমাত্র মানুষের অবিবেচিত বৃক্ষচ্ছেদন , জলাভূমিকে বাসজমি বা কৃষিজমিতে রূপান্তর প্রভৃতি কারণের জন্য। প্রতি বছর বাংলাদেশ ও ভারতের গ্রামবাসীরা নির্মম ভাবে মেছোবিড়ালদের মেরে ফেলে। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলাতে ২০১০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে প্রায় ২৭টি মৃত মেছোবিড়াল উদ্ধার করা হয়। আবার বাংলাদেশের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী , ২০১০ থেকে ২০১৩ এর মধ্যবর্তী সময়ে সেখানের স্থানীয় মানুষের হাতে নিহত অন্তত ৩০ টি মৃত মেছোবিড়ালের হদিস পাওয়া যায়। থাইল্যান্ড থেকে আরেকটি দুঃখজনক খবর উঠে আসে যে , সেখানে রেডিও ট্র্যাক করা সমস্ত মেছোবিড়ালদের মধ্যে প্রায় ৮৪% মেছোবিড়াল হয় শিকারির হাতে কিম্বা কোনো অজ্ঞাত কারণে মারা পড়েছে। শুনলে হয়তো আরও অবাক হবে যে , এই মেছোবিড়াল একসময় দক্ষিণভারতের মধ্যে কেরালাতে প্রচুর পাওয়া যেত কিন্তু বর্তমানে মেছোবিড়াল এখন কেরালাতে বিলুপ্ত! [সূত্র]

image

আমাদের দেশের বন্যপ্রাণ আইন অনুযায়ী বাঘ ও বাঘরোল বা মেছোবিড়ালের সংরক্ষণ হিসাবে মর্যাদা এক। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে , আমরা দেখেছি , বাঘ মেরে অনেকে শাস্তি পায় বা পাচ্ছে , কিন্তু কখনও তো এমন শুনলাম না যে মেছোবিড়াল মেরে কারো কোনো শাস্তি হল!! ২০১৮ কিম্বা ২০১৯ সালটা ঠিক মনে নেই, আনন্দবাজারে একটি খবর পড়েছিলাম, ভাঙড়ে একটি মেছোবিড়ালকে পিটিয়ে মারা হল; ফেসবুকেও বেশ ভাইরাল হয়েছিল সেই ভিডিও। কিন্তু তারপরে আর শুনলাম না যে কারো কোনো শাস্তি হয়েছে! এইসব দেখে আমার মনে একটাই প্রশ্ন উঠেছিল , মানুষের মনে কিসের এত বিদ্বেষ? যে এমন একটি নিরীহ প্রাণীকে মেরে ফেলা হল। কোনো অবলা প্রাণীকে অন্যায়ভাবে মেরে নিজের বীরত্ব জাহির করা যায়না, তা নাহলে বলতেই হয় বিন লাদেনও বিরাট বীর ছিলেন, উনি তো আবার একটা দুটো নয় হাজার হাজার প্রাণ নিয়েছিলেন 🤷। কি আজব এই বিশ্ব তাই না। আমরা নিজেদের মধ্যেও সমতা সৃষ্টিতে ব্যর্থ আবার প্রাণীদেরও সমতা দিতে ব্যর্থ!

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন মেছোবিড়াল মোটেই ভয়ঙ্কর জীব নয়, এদের আক্রমণে কোনো মানুষ যে আহত বা নিহত হয়েছেন এমন খবরও আমার জানা নেই (তোমার জানা থাকলে নিশ্চয়ই কমেন্ট করে জানিও)। আর এদের সবথেকে প্রিয় খাদ্য মাছ তবে দিন দিন পুকুর , নদী থেকে অত্যাধিক পরিমাণ মাছ তুলে নেওয়ার ফলে, এদের বাসযোগ্য স্থান দিন দিন হ্রাস হওয়ার ফলে এরা কোনো কোনো সময় খুদার তাড়নায় মানুষের বাসস্থানে খাদ্যের সন্ধানে চলে আসে, আর সেই সময় মানুষ এদের চিতাবাঘ ভেবে আতঙ্কিত হয়ে এদের আক্রমণে উদ্যত হয়। এই হল আমার মতে মুল সমস্যা।

image

তবে এই সমস্যারও সমাধান আছে , আন্তর্জাতিক স্তরে বাঘরোল সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ তিয়াষা আঢ্য আনন্দবাজার পত্রিকাকে বলেছেন, "এই প্রাণীদের বাঁচাতে বিভিন্ন সরকারি দফতর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে একযোগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজ করতে হবে" । এছাড়া তিনি আরও বলেন , "হাওড়া জেলায় এমন ভাবে কাজ করে লাভ হয়েছে। এখন বাঘরোল দেখলে হাওড়ার বাসিন্দারা দ্রুত বন দফতরে খবর দেন, পিটিয়ে মারেন না" । [সূত্র]

অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে আসার আলো এখনো আছে , আমরা যদি বিদ্যালয় স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের এইসব বিপন্ন প্রাণীদের সম্পর্কে জ্ঞানলাভে সাহায্য করি এবং দৈনিক জীবনে এইসব প্রাণীদের সম্মুখীন হলে আমাদের কী করনীয় এই ব্যাপারে তাদের অবগত করি, তাহলে ভাঙড়ের মত ঘটনা আর কোনোদিন ঘটবে না।

নিজেরা সচেতন হও, অন্যদেরও সচেতন করো, আমাদের এই রাজ্যপ্রাণী মেছোবিড়াল সম্পর্কে।

মেছো খুব নিরীহ / ওরা বলে একবার আই এদিকে / করে দি পিটে তোকে ঠাণ্ডা / দিয়ে মোটা ডাণ্ডা!

~ পলাশ বাউরি

মন্তব্যসমূহ

  1. সত্যিই, এই নিরীহ জীবগুলিকে সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আমি ডিপ্রেশনে আক্রান্ত!

সমাজ ও সিনওলি

ধর্ষণ ও আমরা